তড়িৎক্ষেত্র, তড়িৎ বলরেখা ও তড়িৎ তীব্রতা বা প্রাবল্য
তড়িৎক্ষেত্র, তড়িৎ বলরেখা ও তড়িৎ তীব্রতা বা প্রাবল্য
আগের দিন আমরা দুইটা চার্জের মধ্যে গুতাগুতি আর টানাটানি (কুলম্বের বল) নিয়ে পড়েছিলাম, তাই না? আজকে আমরা দেখব, এই কাণ্ডটা আসলে কেন ঘটে। একটা চার্জ আরেকটা চার্জকে দূর থেকে কীভাবে বল পাঠায়? ম্যাজিক নাকি? চলো, এই ম্যাজিকের রহস্যটা আজ বের করি!
তড়িৎক্ষেত্র বা Electric Field (চার্জের নিজস্ব এলাকা!)
ভাবো, তোমার বাসায় একটা WiFi রাউটার আছে। তুমি কি WiFi সিগন্যাল চোখে দেখতে পাও? পাও না। কিন্তু তুমি জানো, রাউটারের চারপাশে একটা নির্দিষ্ট এলাকা জুড়ে এর প্রভাব আছে। ওই এলাকার মধ্যে মোবাইল বা ল্যাপটপ আনলেই নেট কানেক্ট হয়ে যায়, কিন্তু এলাকার বাইরে গেলে আর হয় না।
তড়িৎক্ষেত্র বা ইলেকট্রিক ফিল্ড ঠিক এই WiFi জোনের মতোই একটা ব্যাপার!
- প্রত্যেকটা চার্জের চারপাশে তার নিজস্ব একটা "প্রভাবের এলাকা" থাকে।
- এই অদৃশ্য এলাকাটাকেই বলা হয় তড়িৎক্ষেত্র।
- ওই এলাকার মধ্যে অন্য কোনো চার্জ এলেই সে একটা বল (আকর্ষণ বা বিকর্ষণ) অনুভব করে। মানে, হয় তাকে কেউ টানছে, নয়তো ধাক্কা দিচ্ছে।
একটা চার্জের চারপাশে যে এলাকা জুড়ে তার পাওয়ার বা প্রভাব খাটে, সেটাই হলো তার তড়িৎক্ষেত্র।

তড়িৎ বলরেখা বা Electric Lines of Force (ফিল্ডটাকে আঁকার চেষ্টা)
আমরা তো বুঝলাম যে তড়িৎক্ষেত্র দেখা যায় না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হলেন আঁকিবুঁকির মানুষ! তারা বললেন, "যেটা দেখা যায় না, সেটাকে যদি আমরা ছবি এঁকে বুঝতে পারি, তাহলে কেমন হয়?"
এই ছবি আঁকার জন্যই তারা কিছু কাল্পনিক রেখা বা লাইন কল্পনা করলেন। এই কাল্পনিক রেখাগুলোকেই বলা হয় তড়িৎ বলরেখা।

বাস্তব উদাহরণ: একটা চুম্বকের চারপাশে যদি তুমি কিছু লোহার গুঁড়ো ছড়িয়ে দাও, দেখবে গুঁড়োগুলো খুব সুন্দর প্যাটার্নে সেজে গেছে। ওই গুঁড়োগুলোর লাইনগুলোই তোমাকে চুম্বকের অদৃশ্য ফিল্ডটা দেখিয়ে দিচ্ছে। তড়িৎ বলরেখাও ঠিক একই কাজ করে!
⭐ বলরেখা বোঝার ট্রিকস
এই রেখাগুলো কিছু নিয়মকানুন মেনে চলে। নিয়মগুলো মনে রাখলেই হল।
ট্রিক ১ (ডিরেকশন): বলরেখা সবসময় পজিটিভ (+) চার্জ থেকে বের হয় আর নেগেটিভ (-) চার্জে গিয়ে শেষ হয়।
মনে রাখার উপায়: ভাবো, পজিটিভ (+) মানে হলো "দাতা", সে সবসময় শক্তি দেয় (তীর চিহ্ন বাইরের দিকে)। আর নেগেটিভ (-) মানে হলো "গ্রহীতা", সে সবসময় শক্তি নেয় (তীর চিহ্ন ভেতরের দিকে)।
ট্রিক ২ (ঝগড়া করে না): দুইটা বলরেখা কখনোই একে অপরকে কাটাকাটি বা ছেদ করে না।
কেন? কারণ যদি কাটাকাটি করতো, তাহলে ওই কাটা পয়েন্টে চার্জটা কনফিউজড হয়ে যেত যে সে কোন দিকে যাবে! একদিকে তো আর দুই রাস্তায় যাওয়া যায় না, তাই না?
ট্রিক ৩ (পাওয়ার মাপার উপায়): যেখানে বলরেখাগুলো খুব ঘন বা কাছাকাছি থাকে, সেখানে তড়িৎক্ষেত্রের পাওয়ার বেশি। আর যেখানে ফাঁকা ফাঁকা থাকে, সেখানে পাওয়ার কম।
মনে রাখার উপায়: একটা জায়গায় অনেক মানুষ থাকলে যেমন ভিড় বেশি আর প্রভাবও বেশি, ঠিক তেমনি।
তড়িৎ তীব্রতা বা প্রাবল্য (ফিল্ডের পাওয়ার কতটুকু?)
আমরা WiFi জোনের কথা বলেছিলাম, তাই না? ধরো, তুমি রাউটারের একদম কাছে বসে আছ, তখন মোবাইলে সিগন্যাল কী দেখায়? Full Bar! আবার যখন অন্য রুমে চলে যাও, তখন সিগন্যাল কমে গিয়ে এক বা দুই বার হয়ে যায়।
তড়িৎ তীব্রতা বা প্রাবল্য হলো ঠিক এই Wi-Fi সিগন্যাল বারের মতো! এটা দিয়ে আমরা বুঝি, তড়িৎক্ষেত্রের কোনো একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে পাওয়ার বা শক্তি কতটুকু।
সহজ ভাষায়: তড়িৎক্ষেত্রের কোনো একটা পয়েন্টে যদি তুমি একটা +১ কুলম্বের চার্জকে ভাড়া করে এনে বসিয়ে দাও, তাহলে ওই চার্জটা যে পরিমাণ বল বা ধাক্কা অনুভব করবে, সেটাই হলো ওই পয়েন্টের তড়িৎ তীব্রতা।
সূত্রটা কী?
মানে,

⭐ তীব্রতা মনে রাখার শর্টকাট ট্রিক
"তড়িৎ তীব্রতা হলো প্রতি কুলাম্ব চার্জের জন্য বরাদ্দকৃত ধাক্কা বা টান।"
ধরো, একটা পয়েন্টে তীব্রতা 5 N/C (নিউটন পার কুলম্ব)। এর মানে হলো, ওই জায়গায় তুমি যদি ১ কুলম্বের চার্জ রাখো, সে ৫ নিউটন বল অনুভব করবে। যদি ১০ কুলম্বের চার্জ রাখো, তাহলে সে (৫ × ১০) = ৫০ নিউটন বল অনুভব করবে। কী সোজা!
⭐ তীব্রতার দিক বের করার নিনজা টেকনিক ⭐
🔥 মনে রাখবে: কোনো বিন্দুতে তড়িৎ তীব্রতার দিক বের করতে বললে, আর সেখানে কোনো চার্জ দেওয়া না থাকলে, সবসময় মনে মনে ওই বিন্দুতে একটা পজিটিভ ১ কুলম্ব (+1C) চার্জ কল্পনা করে নেবে এবং দুদিক থেকেই এর তীব্রতা বের করবে।
এবার দেখো মজা!
- যদি পাশের কোনো পজিটিভ চার্জ থাকে, সে এই +1C চার্জকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেবে। তাহলে দিক হবে বাইরের দিকে।
- আর যদি পাশের কোনো নেগেটিভ চার্জ থাকে, সে এই +1C চার্জকে টান দিয়ে কাছে নিয়ে আসবে। তাহলে দিক হবে ভেতরের দিকে।
🔥 দুই দিক থেকে তীব্রতা আসলে কী করব? (লব্ধি তীব্রতা) 🔥
ধরো, একটা পয়েন্টে দুইটা চার্জই (q1 আর q2) তাদের পাওয়ার দেখাচ্ছে। তখন ওই পয়েন্টের মোট তীব্রতা কত? এটাও দড়ি টানাটানি খেলার মতো!
স্টেপ ১: প্রথমে, q1 চার্জের জন্য ওই পয়েন্টে তীব্রতা (E₁) বের করো। তারপর q2 চার্জের জন্য তীব্রতা (E₂) বের করো।
স্টেপ ২: এবার আমাদের নিনজা টেকনিক (+1C চার্জ বসানোর বুদ্ধি) দিয়ে দুইটা তীব্রতার দিক (E₁ ও E₂ এর দিক) বের করে নাও।
স্টেপ ৩ (হিসাব):
- যদি দুইটা তীব্রতার দিক একই দিকে হয় (মানে দুইজনই একদিকে ধাক্কা দিচ্ছে বা টানছে), তাহলে মোট তীব্রতা হবে তাদের যোগফল (
)। - আর যদি দিক উল্টো দিকে হয় (একজন ডানে টানছে, আরেকজন বামে), তাহলে মোট তীব্রতা হবে তাদের বিয়োগফল (
)। বড়টা থেকে ছোটটা বিয়োগ।
ফাইনাল দিক: মোট তীব্রতার দিক কোনদিকে হবে? আরে, যে জিতবে তার দিকে! মানে, যার পাওয়ার (তীব্রতা) বেশি, ফাইনাল দিকটাও হবে তার দিকেই।
:::warning
💡 মনে রেখোঃ
এখানে আমরা লব্ধি বল বা প্রাবল্য যাই হিসেব করি না কেন, যোগ-বিয়োগ করার সময় আমরা শুধু মানের দিকে খেয়াল রাখবো। +/- এর দিকে না। শুধু বড়ো মান থেকে ছোটো মান বিয়োগ করবো।
এক্ষেত্রে তুমি প্রাবল্যের মডুলাস মান নিয়ে কাজ করতে পারো। মানে এভাবে,
:::
Questions to Solve
১১। বাতাসে 100C চার্জ হতে 1m দূরে কোন বিন্দুতে বৈদ্যুতিক প্রাবল্য নির্ণয় কর।
(9 × 10¹¹ NC⁻¹)
১২। কত প্রাবল্যের একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে একটি ইলেক্ট্রন স্থাপন করলে ইলেক্ট্রনটি তার ওজনের সমান বল অনুভব করবে?
(5.57 × 10⁻¹¹ NC⁻¹)
১৩। 3.23 × 10⁻¹⁹C চার্জের একটি প্লাস্টিক বল কোন স্থানে 2.6 ×10⁴ volt/m প্রাবল্যের একটি সুষম বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা হলো। উক্তস্থানে অভিকর্ষজ ত্বরণের মান 10ms-2 হলে বলটির ভর নির্ণয় কর।
(8.398 × 10⁻¹⁶ kg)
১৪। 1.5 × 10⁻⁹ C চার্জে চার্জিত একটি ক্ষুদ্র গোলককে বায়ুতে স্থাপন করা হলো। গোলক হতে 0.12m দূরে কোন বিন্দুতে তড়িৎ প্রাবল্য নির্ণয় কর।
(937.5 NC⁻¹)
১৯। কোন তড়িৎ ক্ষেত্রে 10C এর একটি আহিত বস্তু স্থাপন করলে যদি সেটি 400N বল লাভ করে তবে ঐ বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্রের তীব্রতার মান নির্ণয় কর। (40 NC⁻¹)
১০। A ও B বিন্দুতে স্থাপিত দুইটি চার্জ q₁ = 3 × 10⁻⁶C ও q₂ = 5 × 10⁻⁶C পরস্পর থেকে 6m দূরে অবস্থিত।
(গ) চার্জ দুটির মধ্যে ক্রিয়াশীল বলের মান নির্ণয় কর। (3.75 × 10⁻³ N)
(ঘ) AB সরলরেখার উপর A হতে 2m দূরে তড়িৎ ক্ষেত্রের দিক গাণিতিকভাবে নির্ণয় কর। (A হতে B এর দিকে)
১১।

(গ) A এর কারণে B বিন্দুতে সৃষ্ট তড়িৎ তীব্রতা নির্ণয় কর। (5.625 × 10¹² NC⁻¹)
(ঘ) C তে একক ধনাত্মক চার্জ স্থাপন করলে এটি কোন দিকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখাবে – গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখাও। (B এর দিকে)
১২।

চিত্রের A, B, C তিনটি গোলক যথাক্রমে +8C, -10C এবং +5C চার্জ আছে।
(গ) উপরোক্ত চিত্রের B বস্তুটির উপর ক্রিয়াশীল বলের পরিমাণ নির্ণয় কর।
(আকর্ষণ বল, 1.08 ×10¹⁰ N)
(ঘ) চিত্রের B বস্তুটির আধান অকার্যকর হলে A ও C বিন্দুর সংযোজক সরলরেখার মধ্যবিন্দুতে তড়িৎ তীব্রতা নির্ণয় কর।
১৩।

(গ) গোলকদ্বয়ের মধ্যকার ক্রিয়াশীল বল নির্ণয় কর।(1.08 × 10¹⁰ N)
(ঘ) গোলকদ্বয়ের কারণে P বিন্দুতে প্রাবল্য কত হবে? (3.92 × 10⁹ NC⁻¹, বাম দিকে)
১৪। A ও B বিন্দুতে যথাক্রমে 30 কুলম্বের দুটি আধান রয়েছে। P বিন্দুটি AB দূরত্বকে 1:2 অনুপাতে অর্ন্তবিভক্ত করে। AB = 12m।
(গ) মধ্যবর্তী বলের মান নির্ণয় কর। (5.625 × 10¹⁰ N)
(ঘ) A ও B বিন্দুর আধানদ্বয়ের জন্য P বিন্দুতে তড়িৎ তীব্রতার মান একই হবে কিনা-গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই কর। (ভিন্ন হবে)
১৫।

A বিন্দুটি PQ দূরত্বকে 1:3 অনুপাতে অন্তঃবিভক্ত করে।
(ঘ) P ও Q বিন্দুতে স্থাপিত আধানদ্বয়ের জন্য A বিন্দুতে তীব্রতার তুলনা কর। (6:1)
[📌Hint: P ও Q চার্জের জন্য A বিন্দুতে তড়িৎ তীব্রতা বের করে ভাগ করবা]
১৬। পরস্পর থেকে 1.20m দূরে অবস্থিত 30 × 10⁻⁶ C এবং -60 × 10⁻⁶ C এর দুটি আধানের সংযোগ রেখার ঠিক মধ্যস্থলে তড়িৎ প্রাবল্য কত হবে? (2.25 × 10⁶ NC⁻¹)
[📌Hint: 12 এর ঘ যেভাবে করছি, কিন্তু এখানে দিক একই হবে তাই যোগ হবে, E = E₁ + E₂]